ছবি আঁকাটাও পড়াশোনারই বিষয়।

ছবি আঁকাটাও পড়াশোনারই বিষয়।

May 16, 2024

সকাল সন্ধ্যা না হোক, একটা নির্দিষ্ট রুটিন চাই ছবি আঁকার। 

পড়ার সময় ছবি আঁকা নিষেধ। ছবি আঁকার জন্য অবসর সময় বা বিকালে কম খেলে ছবি আঁকতে হবে। একথা ছোটবেলায় আমরাও শুনেছি। আর বর্তমানে বিকেলটাও আর তো খেলার সময় নয়। টিউশনিতে পড়ার সময়। তাহলে ছবি আঁকবে কখন! ছুটি ছাটা পেলে বেশি করে এঁকে নিতে হবে! কিন্তু কোনো বিষয়ের প্রতি ভালোলাগা কি এইভাবে তৈরি হয় ? হয় না। আজ নয় বহুদিন ধরে এই ছোটরা খুব ব্যস্ত, সত্যিই তারা সময় পায়না। একটা ছোট ছেলে মেয়ের সারাদিনের রুটিন এই রকম - সকাল ছটায় ঘুম থেকে উঠে পড়তে বসা বা পড়তে যাওয়া, স্নান খাওয়া করে দশটা সাড়ে দশটার মধ্যে স্কুল যাওয়া, তিনটে বা চারটের মধ্যে ফিরে আবারও পড়তে যাওয়া, টিফিন করে সন্ধ্যায় আবারও পড়তে যাওয়া, বাড়ি ফিরে নটায় বাবা বা মায়ের কাছে অঙ্ক করতে বসা। তারপরেও তারা ছবি আঁকে, গান গায়, তবলা শেখে, গিটার শেখে, ক্যারাটে বা সাঁতার কাটতে যায়, আরও কত কি। সত্যি ভাবা যায় না। ছোটরা কিন্তু ভাবে না এগুলো তারা করে। তারপরও অভিভাবকদের ঝুড়িঝুড়ি নালিশ থাকে ওদের বিরুদ্ধে। আঁকতে চায় না, পড়তে চায় না, গান প্র্যাকটিস করেনা, সাঁতারে তো জোর করে করে নিয়ে যাই। স্যার বকবেন, স্যার মারবেন। এত প্রতিকূলতার মধ্যে আমি ওদের ছবিকে ভালোবাসতে শেখাই। বহু বছর আগে বুধবার সকাল সাতটায় আমি একটি বাড়িতে আঁকা শেখাতে যেতাম। পাশাপাশি বাড়ির একটি ছেলে এবং একটি মেয়ে ছবি আঁকতো। ছেলেটি

blue painting

এক সময় আর বাড়িতে কোনো ছবি আঁকতো না। ক্লাসে এসেও কিছু আঁকতে চাইতো না। বলতো সৌমেন দা একটু বসি, তোমার সাথে একটু কথা বলি, একটু গল্প করি, একমাত্র তোমার সাথে একটু গল্প করার সময় পাই। কাল রাত দুটো পর্যন্ত অঙ্ক করিয়েছে বাবা। তারপর সাড়ে ছটায় উঠে সাতটায় তোমার কাছে আঁকতে এসেছি, বলো আর ভালো লাগে? আমি জিজ্ঞাসা করলাম রাত্রি দুটো পর্যন্ত বাবা অঙ্ক করালেন, কটা থেকে বসেছিলিস? বাবা ইঞ্জিনিয়ার ছিলেন, মেট্রোরেলে সার্ভিস করতেন। রাত্রি এগারোটায় অফিস থেকে ফিরে বারোটায় বসতেন দুটো পর্যন্ত অঙ্ক করাতেন। এটা যেদিন যেদিন এগারোটায় ফিরে পড়তেন সেদিন এটাই করতেন। একদিন ছেলেটির মায়ের সাথে কথা বললাম। মা জানালেন সৌমেন ওকে কিছু বোলো না, ও তোমার সাথে একটু রিলিফ পায়, ওইটুকু দরকার। তুমি ওর খাতায় একটু করে ছবি এঁকে দিও। বাবা যদি জানতে পারেন যে  ছবি আঁকেনা তাহলে এই সময়টাও ও আর পাবেনা,  আঁকতেও পাঠাবেন না। এটা কতটা ভালো-মন্দ সেদিকে যাচ্ছি না। কিন্তু সকলে এই চাপটা নিতে পারেনা। একটা মেশিনও কন্টিনিউ চালানো যায় না। রেস্ট দিতে হয়। যদিও বর্তমানে অনেকেই সচেতন। কিন্তু তবুও কোথাও যেন রেষারেষি আমাদের খুব পছন্দ। ছবি আঁকা মফসসলে অবহেলার সাবজেক্ট হলেও বসে আঁকো প্রতিযোগিতা ভীষণ জনপ্রিয়। কোনো এক নটবর কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে তিনজনকে বেছে দেবেন, তাতে ভিড় উপছে পড়তে দেখা যায় আজও। অথচ একটা ওয়ার্কশপ করলে তার

blue painting

দশভাগের এক ভাগেরও ওয়ার্কশপে দেখা মেলে না। এখনো ছবি আঁকার প্রতিযোগিতাকে ছবি আঁকার পরীক্ষা বলে, চিত্র প্রদর্শনীকেও পরীক্ষা বলে, পরীক্ষাকে তো পরীক্ষাই বলে। অর্থাৎ পরীক্ষা, প্রতিযোগিতা, চিত্র প্রদর্শনী  বা ওয়ার্কশপের মানে বা মূল্য সম্পর্কে সঠিক ধারণা আজও নেই। এই জায়গা থেকেই কুড়ি বছর আগে অঙ্কনতীর্থের আন্দোলন শুরু। 'নয় প্রতিযোগিতা হোক প্রদর্শনী' এই বার্তা নিয়ে শুরু হয়েছিল ছবিমেলা। জোর করে নয় বিষয়টিকে ভালোবাসতে হবে। আর আমরা সেটা পেরেছি, তাই আমাদের ছাত্রছাত্রীরা শুধু কলকাতা নয় ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্তে বিভিন্ন আর্ট কলেজে তারা তাদের যোগ্যতা প্রমাণ করেছে। বর্তমানে তারা কর্মক্ষেত্রেও পিছিয়ে নেই। কিন্তু আজও পড়ার সময় ছবি আঁকা নিষেধ। কারণ এখনো আমরা মানতে পারিনা ছবি আঁকাটাও পড়াশোনার একটা সাবজেক্ট।

লেখা - সৌমেন দাশ      ছবি - সমীর তা