ছকের শৈশব

ছকের শৈশব

Jul 18, 2024

ছবি- ইমিল দাস

 

মানব সভ্যতার শুরুর দিকে এবং একটা মানব সন্তানের শৈশবের সূচনায় যদি শুধুমাত্র তাদের আঁকা ছবি লক্ষ্য করা যায় দেখা যায় তাদের ছবির রং রেখা অনেকটাই একরকম। সাবলীল ভাবে রং ও রেখার প্রয়োগ যা ছবিগুলোকে একটা শৈল্পিক মাত্রায় পৌঁছে দেয়। মানব সভ্যতার শুরুর দিকে মানুষ যখন পাহাড়ের গুহার দেওয়ালে ছবি এঁকেছে সেখানে কোনো আঁকার শিক্ষক ছিল না। ফলে তখনকার ছবিতে ব্যক্তি বস্তু প্রকৃতির আকৃতি গুলো ধরার চেষ্টা চলছে। ভুল বলে কিছু ছিল না। মনের ভাব প্রকাশ করাই একমাত্র লক্ষ্য ছিল। বর্তমানে শিক্ষা ব্যবস্থায় ছবি আঁকা ছোটদের স্কুল থেকেই একটা বিষয়। ফলে স্কুলে এবং প্রাইভেটে ছবি আঁকার ক্লাসও খুব তাড়াতাড়ি শুরু হয়। শিশুরা রং রেখায় আঁকিবুকির মাধ্যমে তার নিজের মনের ভাব প্রকাশ করতে থাকে। এবং সেই রঙ রেখায় শিশুটির সমস্ত চরিত্রগত দিক থেকে মিল থাকে। এদিকে স্কুলের পরীক্ষায় নাম্বার কম তাই প্রাইভেটের শিক্ষককে যথেষ্ট গুরুত্ব দিয়ে তাকে শেখাতে হয়। শিশুর আঁকা ছবিতে রঙ বর্ডার লাইনের বাইরে যাতে বেরিয়ে না যায়, একটা বর্ডার লাইন দিয়ে দিতে হবে এবং সঠিকভাবে রং ঘষতে হবে এরকম আরও নানা নির্দেশ। আর সেই নির্দেশ অনুযায়ী যদি কোনো শিশু না করতে পারে তখন তার ছবি ভুল হয়েছে খারাপ হয়েছে। বাবা-মা বকাঝকা করছেন, প্রাইভেটের শিক্ষক বকাঝকা করছেন আর স্কুলের শিক্ষক কম নাম্বার দিচ্ছেন। ফলে শিশু প্রথম দিক থেকেই নিজের নিজস্বতায় ছবি আঁকতে ভুলে যায়। এইভাবে চলতে থাকছে বলেই পরবর্তী সময় দেখা যায় অনেকে কিছুতেই আর ছবি আঁকতে চায় না। কেননা অন্যের নির্দেশ অনুযায়ী কাজ করা মানুষের স্বভাবগত নয়। পরে বড় হয়ে বাধ্য হয়ে মানুষ অন্যের নির্দেশ অনুযায়ী কাজ করতে শিখে যায়। 

কিন্তু ছোটদের ক্ষেত্রে উচিত ছিল যত দিন সম্ভব তাদের অন্তত ছবিটা নিজের মতো করেই আঁকতে দেওয়া। ফলে নিজের মতো ভাবতে শেখে, নিজের মতো করে আঁকতে শেখে, নিজের মতো করে সৃজনশীল হয়ে ওঠে। কিন্তু তার তো উপায় নেই। ছোটরা আঁকার শিক্ষকের শেখানো বুলি রপ্ত করে নেয়।

যোগ্য ছবি আঁকার শিক্ষক অভিভাবকে খুশি করতে গিয়ে, স্কুলে যাতে নাম্বার পায় সেদিকে লক্ষ্য রাখতে গিয়ে শিশুটির আঁকা ছবির সম্পূর্ণ কারেকশন করে আসলে শিশুটির ছবি সম্পূর্ণ মুছে শিক্ষক সুন্দর করে ছবি এঁকে দেন। তারপর শিশুটি যেমন রং করল তার ওপরে শিক্ষক আবারও রং বুলিয়ে বর্ডার দিয়ে ছবিটিকে সুন্দর করে দেন। প্রথমত শিশুটি খুশি হল স্যার আমারটা ঠিক করে দিলেন। তারপর বাড়ির বাবা মা বড়রা ছবিটা দেখে খুশি হলেন। শিশুটি কি একবারও ভাববে না যে এই ছবিটি একচুয়ালি তার আঁকা নয় সে শুরু করেছিল মাত্র। বাকি সবটাই স্যারের। এবং এই ভাবেই চলতে থাকে সে কখনোই স্যারের মতো আঁকতে পারে না। তাই স্যার বারবারই কারেকশন করে দেন। তাই একটা সময় শিশুটি বুঝতে পারে ছবি আঁকা তার পক্ষে সম্ভব নয়। সে আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। তারপর চলে জোরজবরদস্তি- মারধর পর্যন্ত। আর না হলে ওর ছবি আঁকায় ন্যাক নেই বলে ছবি আঁকাটা বন্ধ হয়ে যায়। 

এবার বলি কি হওয়া উচিত ছিল। শিশুটি তিন বছর থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত যা খুশি আঁকবে। এবং কি এঁকেছে সেই গল্প মন দিয়ে বাড়ির অভিভাবকদের শুনতে হবে। আর প্রশংসা করতে হবে যাতে তার আরও ছবি আঁকার ইচ্ছা তৈরি হয়। পাঁচ বছর পর একজন সঠিক অঙ্কন শিক্ষক নির্বাচন করতে হবে। যে শিক্ষক শুধুমাত্র ছবি আঁকাই শেখান না নিজের জন্য ছবিও আঁকেন । ছবি যে যার মতো চর্চা করতেই পারেন। কিন্তু একজন শিক্ষকের শিল্পকলা বিষয়ে একাডেমিকভাবে পাশ করা একান্ত জরুরী। না হলে সাধারণত ছবি কি, কেন প্রয়োজন, ছবির স্বাভাবিক ধারণা গুলো তৈরি থাকেনা। ফলে নিজেও ছবি আঁকেন না আর ছাত্ররাও চোখের দেখার ওপরেই আটকে থাকে। মন দিয়ে দেখা কল্পনা দিয়ে দেখা আর সম্ভব হয় না। ছবি বাস্তবতাকে ছাড়িয়ে অতি বাস্তবতায় পাড়ি দেয়। সে জায়গায় ছাত্রছাত্রীরা পৌঁছাবে তখনই যখন শিক্ষক সঠিক হবেন।