হিসাব বলছে ঠিকই আছে (৩)
সৌমেন দাশ

Paintings by Indian contemporary
artist Sri Ramlal Dhar
আত্মতৃপ্তি বা আত্মসন্তুষ্টি খুবই প্রয়োজন। নিজের যেটুকু আছে তাতেই খুশি থাকা যায়, এতে শরীর মন ভালো থাকে। আমাদের কুঁড়ে ঘর থেকে একতলা ছাদের সুন্দর ছোট্ট ঘর হল। রং হলো, লাইট লাগলো, মেঝেতে আলপনা দেওয়া হলো, ছাদে উঠে বহুদূর পর্যন্ত দেখা গেল, ফাঁকা সময় হলেই ছাদে উঠে বসে থাকতে ইচ্ছা হয়, মনে হল একটা ছাদ আছে যার তার আবার দুঃখ কিসের। নিজের বাড়ি যেন স্বর্গ। বেশ আত্মসন্তুষ্টির মধ্যেই কাটছিল। ইতিমধ্যে পাশের বাড়ির পলাশ বাবুর বাড়ির ভীত খনন শুরু হয়েছে। দেখতে দেখতে একেবারে দু মাসের মধ্যে দোতলা বাড়ি কমপ্লিট।

Indian contemporary artist
Shri Ramlal Dhar
আর একতলা বাড়ি ভালো লাগছেনা। ছাদে উঠতে মন চাইছে না। দক্ষিণ দিকের দূর আর দেখা যাচ্ছে না দোতলা ঘরের জন্য। মনে মনে প্ল্যান করে ফেললাম আমিও দোতলা করবো। টাকা জোগাড় শুরু হলো। খেয়ে সুখ নেই, বসে সুখ নেই, শুধুই টাকার চিন্তা। কিভাবে কোন দিকে গেলে কি করলে কিছু টাকা আসতে পারে। বউয়ের সোনা বন্ধক রাখা হলো। ধার দেনা করে মাত্র পাঁচ মাসের মধ্যে দোতলা বাড়ি কমপ্লিট। আবারও ছাদে উঠে বসে ভাবছি, 'জবাবটা দারুন দিলাম'। এরকমই একদিন ছাদে বসে আছি সন্ধ্যেবেলা হাতে চায়ের কাপ, সবে চায়ে চুমুক দিয়েছি, নিচ থেকে কেউ ডাকছে - সৌমেন দা... তাকিয়ে দেখি অনুপ, ইট বালির দোকানের অনুপ, পাওনাদার। বিনীত কন্ঠে বললাম,' ভাই আর কটা দিন সময় দিন'। এভাবে বিভিন্ন পাওনাদার সকাল- বিকাল, দুপুর- রাত্রি আমার রাতের ঘুম ও দিনের খাওয়া দাওয়া সবই সিকেয় তুলেছে। এদিকে বন্ধক ছাড়িয়ে গহনা গুলো কবে আনবো বউ প্রতিদিন একবার করে জিজ্ঞাসা করছে। আমার প্রেশার হাই হচ্ছে। আরও অধিক কাজ করার চেষ্টা, আরও অনেক রোজগার করার চেষ্টা শুরু হলো, তাতে কিছুটা সামাল হলেও সবটা তো হয় না। এদিকে অধিক পরিশ্রমে ও মানসিক টেনশনে শরীরে নানা রোগ এসে গেলো। টাকা পয়সা কদিনের মধ্যেই সকলের শোধ করে দিলেও বেশ কিছু নামিদামি ডাক্তার আর ওষুধের দোকান হয়ে গেল নিত্যদিনের জীবন সঙ্গি। আর ফিরে এল না সেই সুখ, সেই একতলা বাড়ি, মেঝেতে আল্পনা, এক ছাদ সুখ আর বাড়িটাকে স্বর্গ মনে হওয়া। এটা একটা সাধারণ মানুষের গল্প। আমরা অনেক সময়ই অন্যের সাথে নিজেকে তুলনা করতে গিয়ে দুঃখী হই। তাই আত্মসন্তুষ্টির প্রয়োজন আছে, বুঝতে হবে নিজের প্রয়োজনটুকু। কিন্তু শিল্পকর্মে বা চর্চায় আত্মসন্তুষ্টি আসা মানে মৃত্যু।
গল্পের চরিত্র কাল্পনিক, বাস্তবের সাথে কোন মিল নেই। এই লেখা ধারাবাহিক ভাবে চলতে পারে।