অন্য পৃথিবী
ফটোগ্রাফি ও লেখা- শ্রী অমিত শংকর মাইতি শিক্ষক, প্রতিহারপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়
ঝাঁ চকচকে পিচ রাস্তা থেকে নেমে একদিকে নারিকেল গাছের সারি, আরেকদিকে কাজুবাদাম গাছের ঝোপের মাঝখান দিয়ে লাল কা৺কুরে মাটির রাস্তা বেরিয়ে এক গ্রাম। দেড়শোটির মতো বাড়ি নিয়ে গ্রামটি। প্রতিটি বাড়ির সামনের দেয়ালে রঙিন ম্যুরাল। প্রতিটি বাড়ি শিল্পীর স্টুডিও, শিল্পের মিউজিয়াম। এ যেন এক অন্য পৃথিবী, নাম রঘুরাজপুর। ওড়িশা রাজ্যের প্রথম হেরিটেজ শিল্পগ্রাম।

স্নানযাত্রা এবং মাসির বাড়ি যাওয়ার সময় জগন্নাথ দেবের সিংহাসন খালি থাকে সেই সময় সাধারন মানুষের দেবদর্শনের জন্য তাঁর মূর্তির বদলে পটচিত্রে পূজা করা হয়। আর এই পটচিত্রের উৎপত্তিস্থল হল এই রঘুরাজপুর গ্রাম। ঐতিহ্যবাহী "পট” প্রজন্মের পর প্রজন্ম একই পদ্ধতিতে তৈরি হয়ে আসছে। সুতির কাপড় কে তেঁতুল বীজের জলে ভিজিয়ে তার ওপর খড়ি ও প্রাকৃতিক আঠার স্তর দেওয়া হয়। এইরকম সাতটি স্তরের কাপড়ের উপর পাথর ঘষে মসৃণ করে নিয়ে পটচিত্রের ক্যানভাস বা পট্ট তৈরি হয়। তার ওপর প্রাকৃতিক রং দিয়ে ফুটিয়ে তোলা হয় নানান হিন্দু পৌরাণিক কাহিনী। বিশেষত ভগবান শ্রীকৃষ্ণ জগন্নাথ দেবের দশাবতার, রামায়ণ, মহাভারত এবং দশমহাবিদ্যার নানান কাহিনী। মোটিফ এর জন্য সাদা রং তৈরি হয় শঙ্খচূর্ণের ব্যবহারে, হলুদ রং হরিতাল পাথর থেকে, গেরু থেকে লাল এবং অন্যান্য ভেষজ ও খনিজের ব্যবহারে। যদিও বর্তমানে প্রাকৃতিক রঙের দুষ্প্রাপ্যতার কারণে কৃত্রিম রংও ব্যবহার করা হচ্ছে।

"পট” ছাড়াও তসর পেইন্টিং তালপাতায় কু৺দে শিল্পকর্ম, পাথর ও কাঠ খোদাই, কাগজ ও গোবরের শিল্পকর্ম তথা মুখোশ পুতুল ইত্যাদির আঁতুড়ঘর এই দেবভূমি।
রঘুরাজপুর গ্রাম ভারতীয় শাস্ত্রীয় নৃত্যের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ ওড়িশি নৃত্যের "গটিপুয়া" ধারার ধারক ও বাহক। এই নৃত্য জগন্নাথ দেব ও শ্রীকৃষ্ণের উদ্দেশ্যে নিবেদন করা হয় ১২ বছর বয়স পর্যন্ত বালকদের দ্বারা। এই গ্রাম ই গুরু কেলুচরণ মহাপাত্র, গুরু মাগুনি চরণ দাস এবং শিল্পী ডঃ জগন্নাথ মহাপাত্রের জন্মস্থান। শিল্পের অনবদ্যতায় রঘুরাজপুর প্রতিটি ভ্রমণ পিপাসুর মনে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকে।